Uncategorized

আত্মমূল্যায়ন ও আত্মশুদ্ধি

রাষ্ট্র সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হবস, লক ও রুশোর মতবাদে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র সৃষ্টির আগে মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে বাস করত। কিন্তু সেখানে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় তারা পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র সৃষ্টি করে। এ নীতি অনুযায়ী ব্যক্তি এই শর্তে নিজেকে শাসন করার অধিকার ত্যাগ করে এক বা একাধিক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করে যেন অন্যরাও তাদের অধিকার পরিত্যাগ করে তার বা তাদের কাছে অর্পণ করে। এভাবে চুক্তির ফলে কেউ নিজেদের অধিকার হারায়নি বরং জনগণ যে অধিকার সমর্পণ করেছে; রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে সবাই সেটা আবার ফেরত পেয়েছে। এই নীতির মূল অর্থ হলো ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে সংখ্যাগরিষ্টের স্বার্থকে বড় করে দেখা এবং এর মাধ্যমে নিজেদের সার্বিক কল্যাণ সাধন করা। পৃথিবীর প্রতিটা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধির পিছনে এই নীতি কাজ করেছে। একটা দেশের জনগণ যদি ঐক্যবদ্ধ হয়, পরিশ্রম করে, সত্ নেতৃত্বের অনুসারী হয়, আইন মেনে চলে এবং নিজেদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করে তাহলে সেই দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অবধারিত। আর জনগণ যদি বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে পরশ্রীকাতরতা-দলাদলি-দ্বন্দ্ব সংঘাতে লিপ্ত হয়, তাহলে সেই দেশের উন্নয়ন দূরে থাক, জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাপন করাই অসম্ভব হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন এ দেশের জনগণের নৈতিকতা ও ঐক্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বাঙালি জাতিকে নির্মূল করার পরিকল্পনা নিয়ে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করেছিল। টিক্কা ঘোষণা দিয়েছিল, ‘এ দেশের মানুষ না, শুধু মাটি চাই’। সেদিন যদি বাংলাদেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারত, নিজেদের মধ্যে দলাদলি ও বিভেদ সৃষ্টি করত, তাহলে স্বাধীনতা অর্জন দূরে থাক, তাদের অবস্থা হতো উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া আদিবাসীদের মতো।

কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের উন্নয়নে সম্মিলিতভাবে কাজ করার পরিবর্তে কিছু লোক নিজেদের মাও-চারু মজুমদার ভেবে স্বাধীন দেশে বিশৃঙ্খলা ও সংঘাতের সূচনা করে। এখন এরা না থাকলেও এদের সৃষ্ট বিভেদের রাজনীতি থেকে আর মুক্ত হতে পারেনি বাংলাদেশ। শুধু কিছু ব্যক্তির স্বার্থসিদ্ধির অপচেষ্টাই বাংলাদেশের সব সমস্যার মূল কারণ, যেগুলির সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বার্থের কোনো সম্পর্ক নাই।

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় ৫২ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে এ দেশের একটা উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত রাশিয়া, জাপান, জার্মানি বা ফ্রান্সের উন্নত হতে মাত্র ১০ থেকে ১২ বছর সময় লেগেছে। কিন্তু এত সমপদ ও সম্ভবনা থাকার পরও বাংলাদেশের উন্নত দেশে পরিণত হতে না পারা খুবই দুঃখজনক। দুর্নীতির মতো সত্ ও যোগ্য ব্যক্তিদের মূল্যায়ন না করাও এ দেশের পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ। ব্যতিক্রম ছাড়া দেশের একটা এলাকা বা প্রতিষ্ঠানও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে একজন নীতিবান ব্যক্তিকে সম্মানিত করা হয়েছে। ‘সত্-নীতিবান ও দেশপ্রেমিক হয়ে সাধারণ জীবনযাপন করা নির্বুদ্ধিতা এবং চুরি-দুর্নীতি-লুটপাট করে ধনী হওয়া সম্মান ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয়’—এই নীতি সমাজে স্থায়ী রূপ লাভ করেছে।

বাংলাদেশের একমাত্র সমস্যা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নীতিহীনতা এবং এর ফলে সৃষ্ট পরশ্রীকাতরতা, রাজনৈতিক সহিংসতা, দুর্নীতি, বিভেদ ও অনৈক্য। ঔপনিবেশিক আমলের অবসানের পরও দেশের কিছু লোকের আচরণ ঔপনিবেশিকদের মতো। দেশের জনগণের কথা না ভেবে স্বাধীনতার পর থেকে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থে দুর্নীতি, লুটপাট, টাকা পাচার আর সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি—সবকিছু তারাই করছে। দেশ উন্নত হলে জনগণের সবাই তার সুফল লাভ করবে—এই বোধ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত এ দেশের কোনো পরিবর্তন হওয়া অসম্ভব।

বাংলাদেশের প্রতিটা নাগরিকের আত্মমূল্যায়ন করা প্রয়োজন যে স্বাধীনতার এত বছর পরও দেশ কেন উন্নত হতে পারছে না। সব শ্রেণি ও পেশার জনগণের আত্মশুদ্ধি এবং দুর্নীতি-সন্ত্রাস-মাদকমুক্ত এবং আইনের শাসনে পরিচালিত উন্নত দেশ গঠনের ব্যাপারে অঙ্গীকার করা প্রয়োজন। আর এটা যদি সম্ভব হয়, তাহলে স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ পৃথিবীর উন্নত দেশের তালিকায় স্থান পাবে।



Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button